ইভ্যালি থেকে পণ্য কিনলেই অর্থ ফেরতের অস্বাভাবিক অফার দিয়ে ব্যবসা করছে তারা। ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফার দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য কিনলে সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। ‘সাইক্লোন’, ‘থান্ডার্ড স্ট্রং’, ‘ইথারকোয়াক’সহ নানা ধরনের লোভনীয় অফার দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এসব অফারে দেওয়া হয়েছে বড় ধরনের মূল্যছাড়। প্রতিষ্ঠানটির এমন লোভনীয় প্রস্তাবের ফাঁদে এরই মধ্যে পা দিয়েছেন ৩৭ লাখ গ্রাহক। তাঁদের মধ্যে অল্পসংখ্যক গ্রাহক কিছু লাভ পেলেও বেশির ভাগ অনিশ্চয়তায় আছেন অনেক গ্রাহক।

ইভ্যালির ‘সাইক্লোন’ অফারে সাড়া দিয়ে গত ১৩ আগস্ট দুই হাজার ৬৫০ টাকার একটি প্রডাক্ট অর্ডার করেন ক্রেতা রফিক মিয়া। ওই টাকার পরিবর্তে পর পর ১০ বারে তাঁর সাড়ে ২৬ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে তিনি রিপোর্ট ইস্যু করেন। কাস্টমার কেয়ারে অভিযোগও করেন। মেইলও করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান হবে। কিন্তু প্রায় এক মাসেও তিনি অর্থ ফেরত পাননি। বলা হচ্ছে, ইভ্যালির পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে টাকা কাটা হয়েছে; কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি। হাসান বুলবুল নামের এক ক্রেতা অভিযোগ করেন, গত ১২ জুন অর্ডার করা পণ্য তিনি এখনো পাননি।

রফিক মিয়া, হাসান বুলবুলের মতো অনেকেই ইভ্যালির ফাঁদে পা দিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনলাইনে পণ্য কেনাকাটায় ই-কমার্সের নামে এই প্রতারণা বন্ধে আইন প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আইন না থাকা আর জবাবদিহির অভাবেই ইভ্যালির ৩৭ লাখ গ্রাহক এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। অবশ্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এরই মধ্যে ইভ্যালির কার্যক্রম খতিয়ে দেখছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ই-ভ্যালির বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে। সেটা সঠিক হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইন রয়েছে। সেই আইন অনুযায়ী পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। ই-ভ্যালি গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে কি না, সেটা তো বলতে পারব না। তবে প্রতারণা যে-ই করুক না কেন, সেটার বিচার হতে হবে।’

বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মো. রাজি হাসান বলেন, ‘আমরা ই-ভ্যালির সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছিলাম। সব ব্যাংক থেকে তাদের অ্যাকাউন্টের তথ্য দিতে বলেছি। ব্যাংকগুলো যে তথ্য দিয়েছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ই-ভ্যালির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ পেয়েছি। সেগুলোও যাচাই-বাছাই করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’

জানা গেছে, ই-ভ্যালির কার্যক্রম শুরুর দুই বছর পার না হতেই নানা কৌশলের আশ্রয়ে প্রতিষ্ঠানটি এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। অথচ কম্পানির পরিশোধিত মূলধন মাত্র এক কোটি টাকা। এক বছর আট মাস বয়সী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় নানা অভিযোগ জমা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার ধরন দেখে বিশেষজ্ঞরাও আশঙ্কা করছেন, এতে মানি লন্ডারিংয়ের সুযোগ রয়েছে।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াদুদ তমাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ই-ভ্যালির ব্যবসার মডেল অযৌক্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কি না, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। প্রতিষ্ঠানটির নীতিমালা বদল ও সেবায় কোনো ফাঁকফোকর আছে কি না, তা-ও তদন্ত করছি। আবার ই-ভ্যালির ব্যবসা এমএলএম কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের ক্রেতা ও মার্চেন্টদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ই-ভ্যালির ক্রেতারা যাতে প্রতারিত না হয় সে উদ্যোগ নিচ্ছে ই-ক্যাব।’

সর্বশেষ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-ভ্যালির কার্যক্রমের ধরন অনেকটাই এমএলএম কম্পানির মতো। এমএলএম কম্পানিগুলোর প্রতারণার চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, ই-ভ্যালিও তা-ই করছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মানি লন্ডারিং হচ্ছে এখানে।

আপনার মতামত লিখুন :