আজ শনিবার বিকেলে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে সংসদ ভবন চত্বর। বিভিন্ন নারীবাদী সংগঠনের জোট ‘প্রজন্মান্তরে নারীবাদী মৈত্রী’র ডাকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারী-পুরুষ ব্যানার-ফেস্টুন ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এই বিক্ষোভে অংশ নেয়। বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে পরিস্থিতি মোকাবেলায় ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।

বিকেল ৩টা থেকে নারী সংগঠনের সদস্যরা সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজার সামনে মানিক মিয়া এভিনিউতে জড়ো হতে থাকেন। এক পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদেরকে বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রশাসনের অনুমতি না থাকায় সেখানে সভা-সমাবেশ করা যাবে না। কিন্তু বিক্ষোভে আসা নারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে যেকোনো স্থানে শাস্তিপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই তারা সেখানেই অবস্থান করবেন। সমাবেশের বিষয়টি পরে ভেবে দেখা যাবে। কথা কাটি-কাটির মধ্যেই বিক্ষোভে আসা মানুষের জমায়েত বাড়তে থাকে। বিকেল চারটার দিকে শত শত নারী-পুরুষ ব্যানার ফেস্টুন-প্লাকার্ড নিয়ে সেখানে মিলিত হয়।

এরপর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের মধ্যেই বাদ্যযন্ত্রের বাজনার তালে তালে শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওফে সমগ্র এলাকা। মাঝে মাঝে গানের সুরে ধ্বনিত হয় প্রতিবাদী শ্লোগান। ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে, রুখে দাঁড়াও এক সাথে’, ‘নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, রুখে দাঁড়াও এক সাথে’, ‘সইবো নাকো আমরা আর, নারীর উপর অত্যাচার’, ‘রক্ষা নয়, মুক্তি চাই’-এমন শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সংসদ ভবন চত্ত্বর। সমাবেশ চলাকালে ‘প্রজন্মান্তরে নারীবাদী মৈত্রী’র পক্ষ থেকে নারী পক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরিণ হক ১০ দফা দাবি তুলে ধরে বলেন, মৃত্যু দণ্ড কোন সমাধান নয়, ধর্ষণের সংস্কৃতি সমূলে উৎপাটন চাই।

দাবিনামায় বলা হয়, আমরা সব ধরনের লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার অবসান চাই, সেই সহিংসতা পুরুষতন্ত্র প্রভাবিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো কর্তৃক সমর্থিত হোক বা যে কোন পুরুষ বা পুরুষ দলের দ্বারা সংগঠিত হোক। সমাজের যে-কোন পরিসরে (কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক, সামাজিক বা ব্যক্তিগত) যৌন সহিংসতার ঘটনায় ভূক্তভোগীকে দায়ী করা চলবে না। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা যে-কোন সহিংসতার জন্য পরিবার তাদেরকেই জবাবদিহি করবে। ধর্ষক কোনোভাবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও পরিবারে আশ্রয় ও প্রশ্রয় পাবে না। যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময়ে, যেকোনো প্রয়োজনে, নারীরা চলবে নিরাপদে। সম্মান নারীর শরীরে, এমন ধারণার অবসান চাই। পাঠ্যক্রমে যৌনশিক্ষার পাঠ বাধ্যতামূলক করতে হবে। সাইবার মাধ্যমকে ব্যবহার করে নারীর উপর সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে ধর্ষণের বিষয়টি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আইন সংস্কার করতে হবে।

একইসঙ্গে ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’ কর্তৃক প্রস্তাবিত ১০-দফা দাবিসমূহ অনতিবিলম্বে মেনে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থাৎ লিঙ্গ ও বয়স নির্বিশেষে বীনা সম্মতিতে যেকোনো যৌন কর্মকে অপরাধ গণ্য করে ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন করতে হবে। ভূক্তভোগীকে দায়ী করার সকল ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা বন্ধে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ সংশোধন করতে হবে। লিঙ্গ, ধর্ম, গোষ্ঠি, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, প্রতিবন্ধকতা, যৌন-পরিচতি যৌনতা নির্বিশেষে সব ধরণের ভূক্তভোগী ও সহিংসতা জয়ীর জন্য সুরক্ষা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীদের মামলা পরিচালনাকালে লিঙ্গীয় সংবেদনশীল আচরণ করতে পুলিশ, আইনজীবী, বিচারক ও সমাজকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :