ভ্যাকসিন

এখন সারাবিশ্ব করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে মরিয়া। বিভিন্ন সংস্থার ২৭টি ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে রয়েছে। অনেক দেশই শুরুতেই ভ্যাকসিন পেতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগাম টাকা পরিশোধ কিংবা
চুক্তি সই করেছে । সেই হিসেবে বাংলাদেশ প্রাপ্যতার দৌড়ে এগিয়ে থাকতে বাংলাদেশ সরকার প্রস্তুতি নিচ্ছে ৯ কোটি ডলারের দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ভ্যাকসিন কেনার।

ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছেঃ স্বাস্থ্যসেবা সচিব মোঃ আবদুল মান্নান বলেন। তিনি আরো জানান, রাশিয়া, চীন, আর অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন উৎপাদনে জড়িতদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। করোনা মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক, এডিবির দুটি প্রকল্প চলমান। ওই প্রকল্প যেহেতু কভিড-১৯ সম্পর্কিত তাই সেখানে কিছু পরিবর্তন এনে ওটা আমরা ভ্যাকসিন খাতে ব্যয় করতে চাইছি। তারাও রাজি হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি। ভ্যাকসিন পেলে দেশের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হবে। কারণ, মানুষকে বাঁচাতে হলে তাদের বাঁচতে হবে আগে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউসের সভাপতিত্বে এক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক ও এডিবির অর্থায়নে চলমান দুটি প্রকল্পের পর্যালোচনাকালে এসব সিদ্ধান্ত হয়েছে।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় শুরুর দিকে সরকার যেসব সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা নিয়েছিল, সেখানে অনেক প্রকল্প থেকেই এখন সরে আসছে। কিছু উদ্যোগ বাতিল করে নেওয়া হচ্ছে নতুন প্রকল্প। বিশেষায়িত করোনা হাসপাতাল স্থাপন, সব হাসপাতালে হ্যান্ডওয়াশ কর্নার স্থাপন, বন্দরগুলোয় মেডিকেল সেন্টার স্থাপনের মতো বেশ কিছু কাজ সরকার আর করবে না।

এ ছাড়া পিসিআর মেশিন কেনা, হাসপাতালগুলোয় আইসোলেশন সেন্টার ও আইসিইউ বেড স্থাপনের কার্যক্রম সংকুচিত করা হচ্ছে। কারণ, হাসপাতালে ৭০ ভাগ করোনা শয্যা শূন্য থাকছে। এর পরিবর্তে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের টিকা কেনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, দুই প্রকল্পের মাধ্যমে ৯ কোটি ডলারের ভ্যাকসিন কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এ ৯ কোটি ডলারের মধ্যে বিশ্বব্যাংক ৪ কোটি, এডিবি ২ কোটি ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ৩ কোটি ডলার দেবে সরকার ধারণা করছে, প্রতিটি টিকার দাম পড়বে ৪০ ডলার। ফলে ৯ কোটি ডলারে ২২ লাখ ৫০ হাজার টিকা পাওয়া যাবে। এসব টিকা প্রাথমিকভাবে ডাক্তার, নার্সসহ ১০ লাখ ফ্রন্টলাইনার কর্মী ও সাড়ে ১২ লাখ বয়স্ক নাগরিককে দেওয়া হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিভিন্ন সংস্থার ২৭টি ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে আছে।

এর মধ্যে রাশিয়া প্রথম ভ্যাকসিন প্রয়োগের ঘোষণা দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে গেছে। এর বাইরে ভ্যাকসিন তৈরির কাজে এগিয়ে আছে ব্রিটেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। তিন দেশের ভ্যাকসিনই পরীক্ষামূলক প্রয়োগের তৃতীয় পর্যায়ে আছে। এর মধ্যেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা পেতে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে বিভিন্ন দেশের সরকার।

ব্রিটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘এস্ট্রাজেনেকা’র সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে কত মানুষের ভ্যাকসিন/টিকা প্রয়োজন, তা এখনো নির্ধারণ করেনি সরকার। এটি নির্ধারণের বেজলাইন সার্ভে প্রয়োজন, যা হয়নি। কতগুলো সোর্স থেকে টিকা আসবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি, চুক্তির বিষয়ও খুব একটা এগোয়নি। জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির মতে বাংলাদেশে কী পরিমাণ টিকার প্রয়োজন এবং তা সংগ্রহে কেমন অর্থ ব্যয় হতে পারে অথবা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে কিনা, এ-সংক্রান্ত কাজ এখনই গুছিয়ে রাখা দরকার।

এ ছাড়া টিকা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ, পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন বা কেনার প্রস্তুতি থাকতে হবে। টিকা পাওয়ার পর সংরক্ষণ, বিতরণ, লোকবল, সরঞ্জামসহ সব পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা এখনই ঠিক করে রাখা উচিত। টিকা প্রাপ্তির পর তা প্রয়োগে কোন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা অগ্রাধিকার পাবে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অগ্রাধিকারে কোন জনগোষ্ঠী, তা নির্ধারণ করে রাখা প্রয়োজন।

করোনা মহামারী মোকাবিলায় টিকা গুরুত্ব বিবেচনা করে এ বিষয়ে জাতীয় পরামর্শক কমিটি সম্প্রতি বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো হলো- টিকা আন্তর্জাতিক বাজারে এলে কীভাবে প্রথমেই বাংলাদেশে নিয়ে আসা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা গ্রহণ। বাংলাদেশে কী পরিমাণ টিকার প্রয়োজন, তা সংগ্রহে কত খরচ হবে কিংবা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে কিনা- সেসব বিষয়ে হিসাব করা।

যেসব প্রতিষ্ঠান বা দেশ টিকার ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে আছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা; যাতে টিকা মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পাওয়ামাত্রই বাংলাদেশ তা পেতে পারে। দ্রুত টিকা সংগ্রহ করতে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে অগ্রিম অর্থ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করে কমিটি।

এ ব্যাপারে কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভ্যাকসিন পাওয়ার পাশাপাশি দেশে আনার পর কীভাবে কোথায় কোল্ড স্টোরেজে রাখা হবে তা ঠিক করতে হবে। ভ্যাকসিন আনার পর সিরিঞ্জের টেন্ডার করে তা ফেলে রাখা যাবে না। এ কাজে অংশগ্রহকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের তালিকা করে রাখতে হবে। নয় তো ভ্যাকসিন পাওয়ার পর হুলুস্থূল শুরু হবে।

এই ভাইরাস বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ভ্যাকসিন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হয় কিন্তু এর পর কাকে দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। আমার পরামর্শ থাকবে- স্বাস্থ্যকর্মীদের পর শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের দেওয়া। তাতে দেশের শিক্ষা ও অর্থনীতি সচল হবে। এর পরে বয়স্ক ব্যক্তি ও ধাপে ধাপে অন্য সবাইকে দেওয়া যেতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :