নোয়াখালীতে গৃহবধূকে নির্যাতনের ঘটনায় ৪ জন গ্রেফতার ধর্ষণ-নির্যাতনে মেতে উঠেছে পুরো দেশ

Sayed RokySayed Roky
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৩:৪৫ AM, ০৬ অক্টোবর ২০২০

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বিবস্ত্র করে নারী নির্যাতনের নারকীয় ঘটনায় গতকাল সোমবার পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নির্যাতিতা ওই নারীর করা মামলায় কুখ্যাত দেলোয়ার হোসেনের নাম না থাকলেও তাঁকে গ্রেপ্তারকারী র‌্যাব বলছে, তিনিই ঘটনার মূল হোতা। র‌্যাব সদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার শিমরাইল মোড়ে ওত পেতে থেকে গত রবিবার মধ্যরাতে একটি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও ম্যাগাজিনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করেন। এদিকে গ্রেপ্তার দেলোয়ারের বেগমগঞ্জের মাছের খামার থেকে সাতটি তাজা ককটেল উদ্ধার করেছে র‌্যাব-১১। গতকাল রাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেন র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক সিও লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম।

মামলায় দেলোয়ারের নাম না থাকায় বেগমগঞ্জের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত দেলোয়ার বেগমগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতাদের হাত ধরে আওয়ামী রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। দলে কোনো পদ-পদবি না থাকলেও বেগমগঞ্জের আরেক দুর্ধর্ষ ক্যাডার সুমন বাহিনীর সঙ্গে মিশে সন্ত্রাসী ও ইয়াবাসেবী হয়ে পড়েন। নিজ এলাকা এখলাসপুরসহ পুরো বেগমগঞ্জে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ এখলাসপুর গ্রামে এলে তাঁর হাতে ফুল দিয়ে সবার নজরে আসেন দেলোয়ার। এর পর থেকে তাঁর সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং ইয়াবা কারবার ও সেবন নিয়মিত চলতে থাকে। একটি বাহিনী গড়ে তুলে তিনি এখলাসপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের ক্যাডার পরিচয়ে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন। ২০১৮ সালে পুলিশ তাঁকে অস্ত্রসহ আটক করলেও পরে তিনি ছাড়া পেয়ে যান।

গত ২ সেপ্টেম্বর একদল লম্পট ওই গৃহবধূর (৩৫) ঘরে ঢুকে তাঁকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন চালায়। তাঁর স্বামীকে বেঁধে রেখে দুর্বৃত্তরা নির্যাতনের ভিডিও করে। ওই নারী তাঁর সম্ভ্রম রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালান, অনুনয়-বিনয় করেন, তাদের ‘বাবা’ ডেকেও বাঁচার চেষ্টা করেন। কিন্তু আট-দশজনের দলটি নিবৃত্ত না হয়ে মহা-উল্লাসে বীভৎসকাণ্ড চালিয়ে যায়। বাধা পেয়ে ওই নারীকে মারধরও করে। পা দিয়ে তার মুখ ও শরীর চেপে ধরে থাকতে দেখা যায়।

পরে ওই ভিডিও ফাঁস করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ওই নারীকে কুকর্ম করার প্রস্তাব দেয়। টাকা দাবি করে। ব্যর্থ হয়ে ঘটনার প্রায় এক মাস পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিওটি ফাঁসই করে দেয়। ভয়াবহ ওই ফুটেজ ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে-ঘৃণায় তোলপাড় হয় সারা দেশে। তৎপর হয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। লোকলজ্জা ও ভয়ে পালিয়ে থাকা নির্যাতিতা নারীকে বেগমগঞ্জ থানার পুলিশ জেলা শহর থেকে খুঁজে বের করে থানায় নিয়ে আসে। ঘটনার ৩৩ দিন পর গত রবিবার রাতে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে নির্যাতিতা গৃহবধূ নামোল্লেখ করে ৯ জন ও অজ্ঞাতপরিচয় সাত-আটজনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ও আইসিটি আইনে দুটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার প্রধান আসামি বাদল (২২) এখলাসপুর ইউনিয়নের এখলাসপুর গ্রামের রহমত উল্যার ছেলে এবং বেগমগঞ্জের সন্ত্রাসী দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার একই গ্রামের সাইদুল হকের ছেলে। এর আগে রবিবার বিকেলে এখলাসপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের শেখ আহম্মদ দুলালের ছেলে মো. রহিম (২০) ও রাতে একই এলাকার মৃত আব্দুর রহিমের ছেলে মো. রহমত উল্যাহকে (৪১) গ্রেপ্তার করে বেগমগঞ্জ থানার পুলিশ। তাঁদের দুজনকে গতকাল বিকেলে ৩ নম্বর বেগমগঞ্জ আমলি আদালতের বিচারক মাশফিকুল হকের আদালতে তুলে পুলিশ সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানায়। বিচারক শুনানি শেষে উভয় আসামির নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন মামলায় তিন দিন এবং পর্নোগ্রাফি আইনে তিন দিন করে মোট ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২ সেপ্টেম্বর ওই নারীর স্বামী দীর্ঘদিন পর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য বাড়িতে আসেন। রাত ৯টার দিকে তাঁরা ঘরের মেঝেতে ঘুমাচ্ছিলেন। এ সময় বাদলের নেতৃত্বে সাত-আটজন বসতঘরের দরজায় লাথি মেরে ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁর স্বামীকে মারধর করে পাশের কক্ষে নিয়ে বেঁধে রাখে। এরপর আসামিরা টর্চলাইটের আলো জ্বালিয়ে তাঁর পরনে থাকা কাপড়চোপড় টেনে-হিঁছড়ে ছিঁড়ে তাঁকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। গৃহবধূ বাধা দিলে তারা মোবাইল ফোনে তাঁর বিবস্ত্র অবস্থার ভিডিও ধারণ করে। ওই নারীর শোরচিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা ঘটনা প্রকাশ করলে তাদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চলে যায়।

ওই নারী ভয়ে ঘটনার কথা কাউকে কিছু না বলে পরদিন বোনের বাড়ি চলে যান। দুর্বৃত্তচক্রটি এরপর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাঁকে ভিডিওর কথা বলে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে। কুপ্রস্তাবে রাজি না হলে ফুটেজ ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। কোনোভাবেই ওই নারীকে কাবু করতে না পেরে চক্রটি ৪ অক্টোবর  ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দেয়। এরপর পুলিশ এলে ওই নারী সব খুলে বলেন এবং পুলিশের সহায়তায় মামলা করেন। বেগমগঞ্জ থানার ওসি মো. হারুন অর রশীদ চৌধুরী জানান, পুলিশ অভিযুক্ত অপর আসামিদের গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে।

এদিকে গতকাল দুপুরে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ওই নারীকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলে সেখানে গাইনি কনসালট্যান্ট তাঁর পরীক্ষা করেন। এ বিষয়ে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মহিউদ্দিন আজিম বলেন, ‘ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। তবে ঘটনাটি পুরনো, তাই আমরা সতর্কতার সঙ্গে দেখছি। রিপোর্ট পেতে দু-এক দিন সময় লাগবে।’

মামলায় দেলোয়ারের নাম নেই

র‌্যাব সদস্যরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার শিমরাইল মোড় থেকে রবিবার মধ্যরাতে একটি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও ম্যাগাজিনসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ভোর সাড়ে ৫টায় ঢাকা জেলার কামরাঙ্গীর চর ফাঁড়ির গলি এলাকা থেকে মামলার প্রধান আসামি মো. নূর হোসেন বাদলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলায় দেলোয়ার হোসেনের নাম না থাকায় বেগমগঞ্জের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণের কাছে দেলোয়ার তাঁকে ফুল দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় অনেকে আমাকে ফুল দিয়েছে। তবে আমি কোনো সন্ত্রাসীকে লালন করি না। দেলোয়ার আমাদের দলের কোনো পদে নেই। আমি সব সময় সন্ত্রাসের-মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি, আমি চাই তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক।’

এখলাসপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন মানু বলেন, ‘দেলোয়ার দলের কেউ নয়। এরা একটা গ্যাং। দলের নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাস করে, ইয়াবা সেবন করে। আমরা তার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।’

গতকাল দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-১১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম জানান, বেগমগঞ্জে নির্যাতনের ঘটনায় মামলার পর র‌্যাবও গোয়েন্দা নজরদারি করে এবং গোপন অনুসন্ধানে নামে। গ্রেপ্তার হওয়া দেলোয়ারের বাহিনীর কয়েকজন সদস্য ২ সেপ্টেম্বর রাতে গৃহবধূর ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে বিবস্ত্র করে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে এবং ঘটনার ভিডিও ধারণ করে।

জানা যায়, ‘দেলোয়ার বাহিনী’ ওই এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং নানা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত এবং দেলোয়ার এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের ভয়ে এলাকার লোকজন ভীতসন্ত্রন্ত। তাঁর বিরুদ্ধে এর আগে দুটি হত্যা মামলা আছে।

বেগমগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশিদ জানান, দেলোয়ারের নামে থানায় মামলা রয়েছে। তিনি সন্ত্রাসী ও ইয়াবাসেবী। তিনি বলেন, ‘নির্যাতিতা ওই মহিলা দেলোয়ারের বিষয়ে কিছু বলেননি। তবে আমরা তদন্তে তাঁর সম্পৃক্ততা পেলে তাঁকে আসামি করব। বর্তমানে র‌্যাব তাঁকে আটক করে নোয়াখালীতে নিয়ে আসার পথে রয়েছে।

গতকাল তাঁর বাড়ি পূর্ব এখলাসপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে কেউ নেই। বিয়ে করেছেন পার্শ্ববর্তী হাজীপুরে। স্থানীয় এলাকাবাসী তাঁর সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে না চাইলেও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

আপনার মতামত লিখুন :