প্রাণঘাতি করোনাকে ছাপিয়ে ধর্ষণ, বস্ত্রহরণ, নির্যাতন এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, মোবাইল ফোনে পর্ন ছবির সহজলভ্যতা, মাদকের বিস্তার, ধর্ষণসংশ্লিষ্ট আইনের সীমাবদ্ধতা, বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং কিছু ক্ষেত্রে বিচারহীনতা। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের এক লাখ ৭০ হাজার মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩.৬৬ শতাংশ মামলা। আর সাজা পাচ্ছে হাজারে মাত্র সাড়ে চারজন। সাজার হার ০.৪৫ শতাংশ। তার মানে ৯৯.৫৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যাচ্ছে। আইনে ত্রুটি, পুলিশি তদন্তে ত্রুটি ও অবহেলা, ফরেনসিক টেস্টের সীমাবদ্ধতা, প্রভাবশালীদের চাপ এবং সামাজিক কারণে এ রকম হচ্ছে। রাষ্ট্রকে আংশিক নয়, সার্বিকভাবে সব বিষয়েই নজর দিতে হবে। সম্প্রতি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের কয়েকটি তোলপাড় করা ঘটনায় সরকার ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন থেকে বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড করে অতি দ্রুততার সঙ্গে অধ্যাদেশ জারি করেছে।

সরকারের এ উদ্যোগ ধর্ষক, নিপীড়কদের ওপর একটা মানসিক চাপ তৈরি করবে; কিন্তু এটা ধর্ষণ প্রতিরোধে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা সময়ই বলে দেবে। শুধু ধর্ষণের সাজা বৃদ্ধি বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ, তদন্তে ত্রুটি ও অবহেলা দূর করতে কিংবা সাজার হার বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয় না। তাই ধর্ষণ-নির্যাতনবিরোধী একটি যুগোপযোগী একক আইন তৈরি করা আবশ্যক। নতুন আইন তৈরির সময় মামলা দায়ের থেকে শুরু করে বিচারের ক্ষেত্রে প্রধান ত্রুটিগুলো নিরসনে মনোযোগ দিতে হবে।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালে ১৮০ দিনের মধ্যে এসব মামলার বিচার শেষ করার বিধান আছে; কিন্তু নানা কারণে তা বছরের পর বছর গড়ালেও শেষ হয় না। দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভিকটিম ও সাক্ষীদের মনোজগতে পরিবর্তন হয়ে যায়। ফলে অনেকেই মামলা না চালিয়ে সালিসের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবেলা করতে চান। আর এভাবে অপরাধীরা শাস্তি না পাওয়ার কারণে অপরাধপ্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।

ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফরেনসিক টেস্ট হলে ধর্ষণের শারীরিক প্রমাণ পাওয়া সহজ হয়। দেরি হলে প্রমাণ বিলীন হয়ে যায়; কিন্তু আমাদের দেশে ভিকটিমদের পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ১০-১২ দিন পর। ফলে এখানেই ধর্ষকের ছাড়া পাওয়ার পথ তৈরি হয়ে যায়। ব্লাস্টের তথ্য মতে, ৭৫ শতাংশ ধর্ষণের সারভাইভর নারীকে স্থানীয় পুলিশ মেডিক্যাল টেস্টের নাম করে অপেক্ষা করতে বাধ্য করে। এফআইআর করতে অস্বীকৃতি জানায়, নানা রকম নথিপত্রগত বা প্রশাসনিক ধমক প্রয়োগের মাধ্যমে মেডিক্যাল টেস্ট বিলম্বিত করে। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালীরা নানাভাবে ধর্ষণের ঘটনাটি আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আর এর মধ্য দিয়ে সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে যায়।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির জন্য কয়েকটি বিষয়ে বাস্তবসম্মত পরিবর্তন আবশ্যক—এক. মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ভয়ভীতি, গড়িমসি ও প্রভাবশালীদের চাপ মোকাবেলা করতে এবং ভিকটিমের মেডিক্যাল টেস্ট বিলম্বিত করা বন্ধ করতে দেশব্যাপী রেডিও, টেলিভিশন ও অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে কিছু বিচারকের হটলাইন নম্বর প্রচার করা যেতে পারে, যাতে ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিচারকদের অবহিত করা যেতে পারে। ধর্ষণের ঘটনা অবগত হওয়ার পরও পুলিশ কর্মকর্তা মামলা নিতে কিংবা ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হলে বিচারকের অবগতিতে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকেও ওই মামলায় ধর্ষণের অপরাধের সহযোগী হিসেবে আসামি করার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ভিকটিমের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য থানায় মামলা দায়েরের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে, ঘটনার পরপরই ভিকটিম চাইলে স্ব-উদ্যোগে ডাক্তারি পরীক্ষার পর পুলিশের কাছে মামলা দায়ের করতে পারবেন মর্মে বিধান করা যেতে পারে। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী যে আদালত বিচার করছেন, সে আদালতের বিচারকের তদন্ত করার সুযোগ নেই; কিন্তু ইনকুইজেটরিয়াল বিচার পদ্ধতিতে বৈচারিক জজের তদন্ত করার ক্ষমতা রয়েছে। এ পদ্ধতির অনুসরণে আমাদের দেশেও ধর্ষণ মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বৈচারিক আদালতকে পরীক্ষামূলকভাবে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষায় পুলিশের গাফিলতির প্রশ্ন উত্থাপিত হলে বৈচারিক আদালত নিজেই এ বিষয়ে তদন্ত করতে পারবেন। এর ফলে পুলিশও প্রভাবশালীদের অবাঞ্ছিত চাপমুক্ত থেকে তদন্ত করতে পারবে।

দুই. বর্তমান আইনে পুলিশ মামলা না নিলে ভিকটিমকে জেলা সদরে গিয়ে এফিডেভিট করে জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মামলা করতে হয়। দেশের মানুষের ন্যায়বিচারের পথ সুগম করতে উপজেলায় আদালত স্থানান্তর আবশ্যিক। উপজেলায় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থাকলে ধর্ষণ-নির্যাতনের ভিকটিমের মামলা দায়ের অনেক সহজ হয়ে যাবে।

তিন. সাক্ষী সুরক্ষা আইন না থাকার কারণে নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেক সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ বোধ করেন না। ফলে সাক্ষীর অভাবে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। দীর্ঘদিন পর রায় হলেও ৯৯ শতাংশের ঊর্ধ্বে আসামিরা খালাস পেয়ে পায়। ভিকটিম ও সাক্ষীর সুরক্ষার জন্য সুরক্ষা আইন পাস ধর্ষণের সাজা বৃদ্ধির চেয়েও জরুরি।

চার. ডিএনএ পরীক্ষা ও অপরাধ প্রমাণের বোঝা এখনো ধর্ষণের শিকার নারীর ওপরই রয়ে গেছে। নতুন আইনে এ দায়িত্ব ধর্ষকের ওপর দিতে হবে। অর্থাৎ ধর্ষককে প্রমাণ করতে হবে সে ধর্ষণ করেনি।

পাঁচ. সাক্ষ্য আইন মেনে ধর্ষণকে যেভাবে আদালতে প্রমাণ করতে হয়, তা অনেক জটিল ও অবমাননাকর। ফলে অনেক ভিকটিম মামলা করলেও আর শেষ পর্যন্ত আদালতে যান না। অপরাধী শনাক্ত করতে গিয়ে ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে বাজে প্রশ্ন করা, হেয় প্রতিপন্ন করা আইনে নিষিদ্ধ করতে হবে।

ছয়. অপরাধী শনাক্ত করতে ফোনকল, এসএমএস, ভিডিও, সিসিটিভি ফুটেজ, গতিবিধি নজর রাখা ও পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণসহ অনেক পদ্ধতি রয়েছে, যা দ্বারা অপরাধ প্রমাণ করা যায়। শুধু ডিজিটাল সাক্ষ্য দ্বারাও অপরাধ প্রমাণিত হতে পারে। ভিকটিম ও সাক্ষী বারবার আদালতে আসতে অনাগ্রহী। তাই ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগে ভিকটিম ও সাক্ষীকে আদালতে হাজির না করেই সাক্ষ্য গ্রহণ করার বিধান করতে হবে। আর এসবের জন্য সাক্ষ্য আইনে ডিজিটাল সাক্ষ্য সংযোজন করা আবশ্যিক। ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও প্রাদেশিক হাইকোর্ট একাধিক মামলার রায়ে স্পষ্ট করে বলেছেন, ভিকটিমের সাক্ষ্য অবিশ্বাস করার কারণ না থাকলে শুধু ভিকটিমের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দিতে কোনো বাধা নেই। ধর্ষিতাকে সাক্ষী জোগাড়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে আমাদের আদালতকেও উপযুক্ত ক্ষেত্রে এ বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। সংগত কারণ ছাড়া সাক্ষী হাজিরে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ধার্য তারিখে অফিশিয়াল সাক্ষী (ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, চিকিৎসক) বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সাক্ষী উপস্থিত না হলে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান করতে হবে।

সাত. বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ ধর্ষণের সংজ্ঞায় প্রতারণার বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা সম্মতিসূচক দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে পরবর্তী সময়ে তাঁদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হলে প্রেমিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করছেন। আর এভাবে ধর্ষণ মামলার কলেবর বাড়ছে দ্রুতগতিতে। বিয়ের আশ্বাস-প্রলোভনে সম্মতিসূচক দৈহিক সম্পর্ক কী যুক্তিতে ধর্ষণ হতে পারে? এসব ক্ষেত্রে নারীটির অজানা নয় যে তিনি যে পুরুষটির সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কে জড়াচ্ছেন, তা আইনত অবৈধ এবং নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। মিথ্যা কাজি সাজিয়ে, ভুয়া কাবিন বানিয়ে কিংবা ভুয়া পুরোহিত সাজিয়ে, সাতপাকের নাটক করে কারো মনে এ ধারণা দেওয়া হলো যে তার সঙ্গে পুরুষটির বৈধ বিয়ে হয়েছে। কিংবা টেলিফোনে বিয়ে সম্পন্ন করে বা উকিল দ্বারা বিয়ের সম্মতি নিয়ে (মেয়েটি যদি বরকে আগে আদৌ না দেখে) বাসরঘরে বরের পরিবর্তে অন্য কাউকে প্রবেশ করিয়ে তাঁকে বর বলে বিশ্বাস করিয়ে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা হলে এরূপ ক্ষেত্রে প্রতারণা ধর্ষণ হতে পারে। প্রতারণার সংজ্ঞাকে তাই সুস্পষ্ট করতে হবে।

আট. ধর্ষণ-নির্যাতনের এক লাখ ৭০ হাজার মামলার বিপরীতে ১০১টি ট্রাইব্যুনাল আছে। তার মানে প্রতি বিচারককে এক হাজার ৬৮৪টি মামলার দ্রুত বিচার করতে হবে। এ মামলার বিচার চলাকালে যুক্ত হবে আরো নতুন মামলা। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের বিচারককে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীনে মামলার বিচার ছাড়াও শিশু আইনের অধীনেও বৈচারিক দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত বিচারের আশা করা যৌক্তিক কী? তাই ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ১০১ থেকে ৫০০-তে উন্নীত করার পাশাপাশি সম্মতিসূচক তথা বিয়ের আশ্বাস-প্রলোভনে দৈহিক সম্পর্কের মামলা প্রকৃত ধর্ষণের মামলা থেকে পৃথক করতে হবে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের বিরাটসংখ্যক মামলার বিচারের ভার ট্রাইব্যুনালের পরিবর্তে অন্য বিচারককে দিতে হবে। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ধর্ষণ-নির্যাতনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ আদালতেও এ বিষয়ে বিশেষ বেঞ্চ স্থাপন করতে হবে। বিচারের রায়ের প্রতিফলন সমাজে দৃশ্যমান করতে হবে।

লাখো শহীদ ও কন্যা-জায়া-জননীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে নজিরবিহীন চড়া মূল্যে অর্জিত আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি ধর্ষণের উপত্যকা হয়ে ওঠার আগেই এর প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইনগত, বৈচারিক ও প্রশাসনিক সংস্কার করতেই হবে।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
zhossain1965@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন :