২০১৫ সালের ২১ মে কুড়িল ফ্লাইওভারে মাইক্রোবাসে ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। এ ঘটনায় পরদিন থানায় মামলা হয়। তদন্ত শেষে দুই আসামির বিরুদ্ধে একই বছরের ২৩ আগস্ট অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর ওই বছরই ঢাকার ৪ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। পরে মামলাটি স্থানান্তর হয় ৯ নম্বর ট্রাইব্যুনালে। কিন্তু এ মামলার বিচার আজও শেষ হয়নি।

শুধু এই একটি মামলা নয়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাঁলাচাদপুরে একটি বাসায় ধর্ষণের শিকার নারীর মামলার বিচার এখনো শেষ হয়নি। এ রকম শত শত মামলা বছরের পর বছর বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।

অথচ ২০০০ সালে করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০(২) নম্বর ধারা অনুযায়ী মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর একটানা বিচার চলতে হবে। আর ২০(৩) ধারা অনুযায়ী ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করতে হবে। এমনকি গত বছরের ১৮ জুলাই হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনার আলোকেও ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা। শুধু এই সময়সীমা নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে না পারলে তা এক মাসের মধ্যে লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টকে জানানোর বিধান ও নির্দেশনা থাকলেও তা মানছেন না কেউই।

এ ছাড়া ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে গত বছর হাইকোর্টের দেওয়া পাঁচ দফা নির্দেশনা কার্যকর না হওয়ায় বিচারপতি ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বুধবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আদালত বলেছেন, ‘আমরা নির্দেশনা দিই ঠিকই; কিন্তু তা কেউ মানে না।’ আদালত আরো বলেন, ‘ধর্ষণের মামলা মনিটরিংয়ের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তাও কেউ মানছে না।’

মাইক্রোবাসে তরুণী ধর্ষণ মামলায় ইতিমধ্যে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিতে হাজির না হওয়ায় মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ আটকে আছে তিন বছর ধরে। তদন্ত কর্মকর্তা যাচ্ছেন না আদালতে। বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নিপারসন আজিম বলেন, ‘আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়ার কথা; কিন্তু তা হচ্ছে না। এটা কাগজেই রয়ে গেছে। বাস্তব চিত্র ভিন্ন।’

তবে ঢাকার ৫ নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর আলী আসগর স্বপন বলেন, ‘আমি যে আদালতে দায়িত্বরত সে আদালতে হাইকোর্টের নির্দেশনা প্রতিপালিত হচ্ছে।’ যদিও হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে মনিটরিং কমিটি গঠিত হলেও সেই কমিটির নিয়মিত বৈঠক হয় না বলে তিনি স্বীকার করেন।

বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ১৮ জুলাই এক রায়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলার বিচার আইনে নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনার পর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিচারকদের উদ্দেশে হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো জারি করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর পরও বেশির ভাগ আদালতে এই নির্দেশনা প্রতিপালিত হচ্ছে না। বিচারাধীন ধর্ষণ মামলার মনিটরিংয়ের জন্য দেশের বিভিন্ন আদালতে মনিটরিং কমিটি গঠিত হলেও এসব কমিটির কোনো বৈঠক হয় না। ফলে কোন মামলায় বিচার বিলম্ব হচ্ছে সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টেও নিয়মিত প্রতিবেদন দেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

হাইকোর্টের পাঁচ দফা নির্দেশনায় যা ছিল : হাইকোর্ট নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে এবং শুনানি শুরু হলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া ছাড়াও আরো তিনটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

এগুলো মধ্যে আছে ধার্য তারিখে সাক্ষী উপস্থিতি ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে মনিটরিং কমিটি করতে হবে, প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট, স্বরাষ্ট্র এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সংগত কারণ ছাড়া সাক্ষীকে আদালতে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করতে হবে। মনিটরিং কমিটি সাক্ষীদের প্রতি দ্রুততম সময়ে যাতে সমন জারি করা যায় সে বিষয়েও মনিটরিং করবে।

আপনার মতামত লিখুন :