গতকাল বৃহস্পতিবার চতুর্থ দিনের মতো বিক্ষোভ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে রাজধানীর শাহবাগে ধর্ষণ ও নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনকারীরা। ওই সমাবেশে যোগ দিয়েছেন বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থেকে আসা এক নারী। তিনি বলছিলেন, ধর্ষকদের ভয়ে এখন সব কিছু ছেড়ে দিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছেন বিচার চাইতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই শহরে আছেন। ধর্ষকরা এখনো প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

এই নারীর মতো আরো কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়, যাঁরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা নপীড়নের শিকার হয়ে এখন বিচার পেতে শাহবাগে এসেছেন। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’-এর ব্যানারে চলমান অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে তাঁদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেন তাঁরা।

আন্দোলনকারীদের গতকালের সমাবেশ থেকে আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় শাহবাগে মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই মহাসমাবেশে সব শ্রেণির মানুষকে উপস্থিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা জানান, ‘ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ নামের এই ব্যানারে ২২টি সংগঠন আন্দোলনে রয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন লোকজন তাঁদের সমর্থনে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তাঁরা মুখপাত্র ঠিক করতে পারেননি। শিগগিরই তাঁদের মুখপাত্র ঠিক করে আন্দোলন আরো বেগবান করবেন।

গতকাল দুপুর ১টার দিকে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, নারীর প্রতি বর্বরতা বন্ধ, নিপীড়ক-ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছে। ওই সময় একটি ব্যানার নিয়ে আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী কর্মসূচিতে যোগ দেন। আর এ সময় আন্দোলনকারীদের হাতে ‘ধর্ষণের জন্য ধর্ষক দায়ী, নারীর পোশাক না’, ‘টনক তুমি নড়বে কবে’, ‘নো মারসি টু রেপিস্ট’, ‘রাষ্ট্র তুমি কার, ধর্ষকের না জনতার?’ এসব পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড ছিল।

গতকাল টানা চতুর্থ দিনের মতো শাহবাগে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি পালন করে। দুপুর সোয়া ১টার দিকে মাইকে এক আন্দোলনকারী ঘোষণা করেন, মৌলভীবাজারে আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ বাধা দিয়েছে, এই সমাবেশ থেকে তাঁরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান।

সারা দেশে অব্যাহত নারী ধর্ষণ ও নিপীড়নের ঘটনায় রাজধানীর শাহবাগে বিক্ষোভে নামেন সাধারণ শিক্ষার্থী, বাম ধারার ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা। সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গণ-অবস্থান ও সমাবেশ করেন তাঁরা। ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ কয়েকটি বামপন্থী সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা এই গণ-অবস্থানে অংশ নেয়। সমাবেশে সরকারবিরোধী নানা স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে সমাবেশে যোগ দিতে এসেছেন। লালবাগ থেকে আসেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইশরাত জাহান প্রীতিলতা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার কারণে কলেজ বন্ধ। ধর্ষণবিরোধী সমাবেশের কথা জেনে তিনি আন্দোলনে যোগ দিতে এসেছেন। ইশরাত বলছিলেন, ‘যত দিন আন্দোলন চলবে তত দিন আসব। ধর্ষকদের বিচার হতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক শোভন রহমান বলেন, সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা এবং এসব ঘটনার বিচার না হওয়ার প্রতিবাদ জানাতে তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন। আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় মহাসমাবেশ ডাকা হয়েছে। তাতে তাঁরা সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ আশা করছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যানার, পোস্টার ও প্ল্যাকার্ডের খরচ চাঁদার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমরা যারা আন্দোলন করছি তারা যে যেমন পারছি চাঁদা দিচ্ছি। এ দিয়েই চলছে।’ কত দিন আন্দোলন চলবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যত দিন ধর্ষকদের বিচার না হবে তত দিন চলবে।’ এখন পর্যন্ত আপনাদের ওপর সরকারের কোনো চাপ আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, আমাদের ওপর কোনো চাপ এখন পর্যন্ত নেই।’

অন্যদিকে জাতীয় ছাত্রসমাজ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে গতকাল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।

এদিকে দেশজুড়ে ধর্ষণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশ ও আলোর মিছিল থেকে ধর্ষকের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করার দাবি জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। গতকাল বিকেলে শিল্পকলা একাডেমির সামনে বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ এ কর্মসূচির আয়োজন করে।

আপনার মতামত লিখুন :