করোনাভাইরাস এর এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রয়োজন বেড়েছে। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকর্মী, অন্য পেশাজীবীসহ প্রায় সবার ইন্টারনেট বা ডাটা সেবায় নির্ভরতা বেড়েছে। বিনোদনও এখন হয়ে উঠেছে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক। অনেকে মোবাইল ইন্টারনেটের ওপরই বেশি নির্ভরশীল। এ কারণে মোবাইল অপারেটরদের ডাটা প্যাকেজ বিক্রি এবং সেই সঙ্গে আয়ও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, এই সংকটকালে গ্রাহকরা অতিরিক্ত ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না মানুষ। কয়েক মাস ধরে ভুক্তভোগীরা বলছেন, মোবাইলে গতি কম থাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ডাটা কিনেও তাঁরা প্রয়োজন মেটাতে পারছেন না। আবার নির্ধারিত মেয়াদে তা শেষও করতে পারছেন না। ফলে তারা এক ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

মোবাইল অপারেটর, আইএসপি (ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান) এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগও বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে কোনো পক্ষই এর প্রতিকারে পদক্ষেপ নিতে পারছে না বা নিচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সমস্যার একটি বড় কারণ হচ্ছে স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ। প্রয়োজনের অর্ধেক স্পেকট্রামও নেই মোবাইল অপারেটরদের। দুই বছর ধরে মোবাইল টাওয়ারের সংখ্যাও বাড়ছে না।

দুই বছর আগে চারটি কোম্পানিকে টাওয়ার ব্যবস্থাপনার লাইসেন্স দেয় বিটিআরসি। এর মধ্যে তিনটি কোম্পানি কাজই শুরু করেনি। আগে থেকে মাঠে থাকা কোম্পানিটিও দুই বছর ধরে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। টাওয়ারের লাইসেন্স দেওয়ার সময় মোবাইল অপারেটরদের বলা হয়েছে, তারা নিজেরা আর টাওয়ার ব্যবস্থাপনা করতে পারবে না। টাওয়ার কম্পানিগুলোই অপারেটরদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে টাওয়ার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।

এর পর থেকেই অচলাবস্থা। অথচ এই অচল অবস্থার মধ্যে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ গ্রাহক বেড়েছে এবং মোবাইল অপারেটররা তাদের দুর্বলতার মধ্যেই গ্রাহক বাড়িয়ে চলেছে।

এ সংকট সম্পর্কে বাংলাদেশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গতকাল শুক্রবার বলেন, ‘আমরা আকস্মিক কিছু ঘটনার সম্মুখীন। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে আকস্মিকভাবে ইন্টারনেটের চাহিদা বেড়ে গেছে। চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে উচ্চগতির ইন্টারনেটের। এর আগে আমরা ভয়েস কলের সেবার মান বাড়ানোর কথা বলতাম। ভয়েস কলে টুজি সেবা হলেই চলে। থ্রিজিতে এ সেবা আরো কিছুটা উন্নত হয়। ইন্টারনেটের এখন যে চাহিদা, তাতে বিস্তৃতভাবে ফোরজির সেবা দরকার। কিন্তু ২০১৩ সালে চালু হওয়ার পর এখনো থ্রিজি সেবা সেভাবে হয়নি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৮ সালে ফোরজি সেবা চালু হয়। মোবাইল ফোন অপারেটররা নিজেদের লাভের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এ সেবা শুধু শহরাঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখে। কিন্তু এখন চাহিদা গ্রামাঞ্চলেও। আমরা মোবাইল অপারেটরদের নির্দেশনা দিয়েছি ২০২০ সালের মধ্যে গ্রামাঞ্চলেও ফোরজি সেবা নিয়ে যেতে হবে।’

স্পেকট্রাম সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, মোবাইল অপারেটররা ২০১৮ সালে খুবই সামান্য পরিমাণে স্পেকট্রাম কেনে। গ্রামীণফোনের এখন সাড়ে সাত কোটি গ্রাহক। তাদের ১০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম প্রয়োজন। কিন্তু আছে ৪০ মেগাহার্টজ। রবিরও স্পেকট্রাম সংকট রয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে স্পেকট্রাম নিলামের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টাওয়ার কোম্পানিগুলোর নিষ্ক্রিয়তা সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা দেরি করলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করারও সিদ্ধান্ত হতে পারে।

এ বিষয়ে মোবাইল ফোন অপারেটরদের সংগঠন এমটব মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ বলেন, হঠাৎ করে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী শহর থেকে গ্রামে চলে যাওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অপারেটররা গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাটার মূল্য কমিয়ে বেশি ডাটা দেওয়ায় এর ব্যবহার বেড়ে যায়। তদুপরি গ্রাহকরা অফিস, ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন ও অন্য অনেক কাজ ঘরে বসে অনলাইনে করছেন, যে কারণে ইন্টারনেটের ওপর চাপ বাড়ছে। দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোবাইলের ওপর নির্ভর করে। যার জন্য পর্যাপ্ত ব্যান্ডউইডথ প্রয়োজন। তবে ইচ্ছা ও প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত দামের কারণে অপারেটররা স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিতে পারেনি। এসব কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইন্টারনেটের গতি হ্রাস পাচ্ছে।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডারদের সংগঠন আইএসপিএবির সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, ‘ইন্টারনেটের চাহিদার ধরন করোনা মহামারি শুরুর পর অনেকটাই পাল্টে গেছে। আমার দুই মেয়ে ও স্ত্রীর আগে ইন্টারনেট ব্যবহারের তেমন প্রয়োজন হতো না। এখন স্কুল-কলেজ বন্ধ। মেয়েরা অনলাইনে ক্লাস করে। স্ত্রীরও লাইফস্টাইল চেঞ্জ হয়েছে। তারও ইন্টারনেটের প্রয়োজন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় যে পরিমাণ ও গতির ইন্টারনেট দরকার, তা আমরা দিতে পারছি না। আগে যেখানে ১০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট লাগত, সেখানে এখন ৩০-৪০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট প্রয়োজন।’

আপনার মতামত লিখুন :